গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ব্যর্থ ই-টিকেটিং সিস্টেম

নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে যাত্রীদের ভোগান্তি যেন নৈমিত্তিক ঘটনা, যা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাড়তি ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানিসহ নানা অভিযোগ উঠছে নিয়মিত।

ভাড়া নেওয়াকে কেন্দ্র করে যাত্রী ও চালকের সহকারী মধ্যে তর্কাতর্কি, হাতাহাতির ঘটনা যেন ঢাকার গণপরিবহ গুলোতে স্বাভাবিক ঘটনা। যাত্রীদের এসব ভোগান্তি নিরসনে রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ’ই-টিকিটিং’ ব্যবস্থা।

তবে বছর শেষ না হতেই বেশিরভাগ বাসে এই ই-টিকেটিং এখন বাক্সে বন্দি হয়ে আছে। আর এতে করে রাজধানীর সড়কে আগের মতোই চলছে ভাড়া নৈরাজ্য। ঢাকা সড়ক বাস মালিক সমিতি প্রথম দফায় ৩০টি কোম্পানির ১ হাজার ৬৪৩টি বাসে ই-টিকেটিং ব্যবহার করেছিল। আর দ্বিতীয় ধাপের ১৫টি মিলিয়ে মোট ৪৫টি কোম্পানি ই-টিকিট ব্যবস্থা চালু করা হয়। এছাড়া, পর্যায়ক্রমে রাজধানীভিত্তিক অধিকাংশ বাসেই চালু করা হয়েছিলো ই-টিকিট ব্যবস্থা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে ৬০টি কোম্পানির ৩ হাজার ৩১৪টি বাস রয়েছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন শহর থেকেও ঢাকায় প্রবেশ করে আরও ৩৭টি কোম্পানির আরও ২ হাজার ৩৩৬টি বাস। সবমিলিয়ে ঢাকা শহরে মোট ৯৭ কোম্পানির ৫ হাজার ৬৫০ বাস চলাচল করে। শুরুর দিকে ই-টিকেটিং নিয়ে যাত্রী থেকে শুরু করে বাসমালিকদেরও বেশ আগ্রহ ছিল।

কিন্তু বছর না পেরোতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে এ ব্যবস্থা। ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে ই-টিকেটিং চালু হলেও বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ রুটে। যার সুযোগে কৌশলে পকেট কাটা হচ্ছে যাত্রীদের। অনেক বাসের ই-টিকিটেই গন্তব্যস্থল ও দূরত্ব উল্লেখ না করে শুধু ভাড়ার পরিমাণ লেখা থাকছে। কিন্তু কত কিলোমিটার দূরত্বের জন্য এ ভাড়া তা উল্লেখ থাকছে না।

আবার টিকিট কাঁটার বিড়ম্বনা এড়াতে গড়পড়তা যাত্রীরা এ নিয়ে মাথা ঘামান না। ফলে এসব বাসে ই-টিকেটিংয়ের প্রচলন থাকলেও বাস্তবে তা নেই। রাজধানীর সদরঘাট থেকে যাত্রা শুরু করার কথা বিহঙ্গ পরিবহন বাসের, যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর থেকে। তবে যাত্রীকে গুনতে হচ্ছে সাদর ঘাট পর্যন্ত ভাড়া। ফিরতি পথেও একই অবস্থা। যাত্রী নামবেন ভিক্টোরিয়া পার্ক, ভাড়া দেবেন সদরঘাটের। শুধু বিহঙ্গ পরিবহনই এ অবস্থা নয়, ভিক্টর ক্লাসিক, আকাশ পরিবহনসহ সদরঘাট থেকে যাত্রা শুরু করা সব বাসের এক দশা। এর মধ্যে নতুন অনিয়ম যোগ হয়েছে ই-টিকিট না থাকা।

গত রোববার গুলিস্তানে প্রায় ৩০টি বাসে সরেজমিনে ঘুরে একটি বাসেও যাত্রীর কাছ থেকে টিকিট দিয়ে ভাড়া আদায় করতে দেখা যায়নি। এমনকি অনেক যাত্রী জানেনও না যে ভাড়ার বিনিময়ে লোকাল বাসে তিনি টিকিট পাবেন। কন্ডাক্টরের দিক থেকেও যাত্রীর টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। যদিও বেশির ভাগ বাসের ভেতর জানালার গায়ে যাত্রীদের উদ্দেশে লেখা রয়েছে-টিকিট ছাড়া ভাড়া দেবেন না। এ ব্যাপারে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে চেষ্টার কমতি নেই। আমরা চাই টিকিটের মাধ্যমে ভাড়া আদায় হোক, কিন্তু কতক্ষণ মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা যায়? যাত্রীদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। যাত্রীরা যদি বলেন টিকিট ছাড়া ভাড়া দেবেন না, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যায়।’

সম্প্রতি মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ১৫টি বাসে চড়ে দেখা যায় যে ১৫টি বাসের মধ্যে মাত্র ২টিতে ই-টিকেটের জন্য পিওএস মেশিন ছিল, যা হেল্পারদের পকেটে পাওয়া গেছে। আয়াত ও শিকার পরিবহনের এই দুটি বাসে হেল্পারদের পিওএস মেশিন ব্যবহার না করে ম্যানুয়ালি ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। বাকি ১৩টি বাসে পিওএস মেশিন ছিল না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাহন পরিবহনের একজন হেলপার (যার পিওএস মেশিন নেই) জানান, মেশিনগুলো তার কোম্পানি ফেরত নিয়া গেছে।

“মেশিনগুলি চালানো কঠিন আর সময় লাগতো অনেক। মেশিন রাখতে রাখতে কাঁধ ব্যথা হয়ে যাইতো। ই-টিকেটিং মেশিন কোথায় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী আবুল কালাম প্রথমে বলেন, মেশিনে চার্জ নেই। পরে এ পদ্ধতিতে অনেক দিন ধরে ভাড়া নেওয়া হয় না বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ই-টিকেটিংয়ে ভাড়া কাটলে আমাদের লোকসানে পড়তে হয়।

অনেক সময় ১৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা দিয়ে যাত্রীরা চইল্লা যায়। তখন তাদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হয়। আর দিনশেষে আমাদের জরিমানা দিতে হয়।’ শিখর পরিবহনের বাস যাত্রী বেসরকারি কোম্পানির কর্মচারী শফিকুল ইসলাম বলেন, ই-টিকিট চালু হওয়ার পর কয়েকদিন তা নির্বিঘেœ চললেও এখন, এটি পুরানো উপায়ে ফিরে এসেছে। ফার্মগেট থেকে মৎস্য ভবন মোড় পর্যন্ত ৩.৫ কিলোমিটারের জন্য সর্বোচ্চ ভাড়া ১০ টাকা।

কিন্তু বাসগুলো তাদের ইচ্ছামতো ভাড়া নেয়। যাত্রীদের অভিযোগ, বাস চালকদের সহকারীরা, যারা এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবেন, তারা টিকিটের জন্য যাত্রীদের তাগাদা সত্ত্বেও টিকিট দিতে আগ্রহী নন। তদুপরি, টিকিটে দেওয়া ফোন নম্বরগুলি বন্ধ থাকায় বঞ্চিত যাত্রীরা ফোন কল দিয়ে অভিযোগ জানাতে পারে না। গত কয়েকদিনে স্পট পরিদর্শনে দেখেছে, মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগ, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন রুটে অধিকাংশ বাস সহকারী ই-টিকেট ছাড়াই ভাড়া নিচ্ছেন।

ফার্মগেট, মিরপুর, গাবতলীসহ অন্যান্য স্পটেও একই অবস্থা। বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সড়কের বাদবাকি বিশৃঙ্খলার সমাধান না করে শুধু ই-টিকেটিং ব্যবস্থা রেখে কোনো সুফল মিলবে না। তিনি বলেন, ‘ই-টিকেটিং নামে আছে, কিন্তু কাজে নেই। এর ফলে এটা টেকসই হচ্ছে না। তাছাড়া সড়কে ই-টিকেটিং সিস্টেম চালু করা হলেও যাত্রীরা কোন স্টপেজে নামবে, সেসব ব্যবস্থাপনা ভালো করে নেই।

গণপরিবহনের কাঠামোগতও অনেক সমস্যা আছে। তাই এসব বিষয়ের দিকেও নজর দিতে হবে। তা না হলে শুধু ই-টিকেটিং ব্যবস্থা রেখে সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকানো সম্ভব নয়।’ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা চাই সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে।

যার জন্য ই-টিকেটিং সিস্টেম চালু করা। নতুন একটি সিস্টেম চালু করলে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান পাওয়া যায় না। যেসব জায়গায় ই-টিকেটিং নিয়ে সমস্যা হচ্ছে ধাপে ধাপে সেই রুটগুলোর বাসের মালিকদের নিয়ে বসব। আশা করি সেসব জায়গায় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আগামীতে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ২০১২-১৩ সালে বাসে প্রথম ই-টিকেটিং ব্যবস্থার প্রচলন করে। তখন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে র‌্যাপিড পাসের মাধ্যমে ই-টিকিটে ভাড়া আদায় শুরু হয়। যদিও দীর্ঘ মেয়াদে এই ব্যবস্থা সফলতার মুখ দেখেনি। নতুন করে ঢাকা সড়ক পরিবহন বাসমালিক সমিতি আবার ই-টিকিটং প্রথার প্রচলন করেছে।

Check Also

তিন মাসের কাজ এখন কয়েক মিনিটে করা যাচ্ছে: আইসিটি প্রতিমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষের হাতের নাগালে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিয়েছেন। গ্রামে বসে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *