ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য যে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা একটি ছবি, একটি পোস্ট কিংবা আপনার অবস্থান অজান্তেই হয়ে উঠতে পারে আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির কারণ। ডিজিটাল এই যুগে সাইবার অপরাধীরা শুধু প্রযুক্তির দুর্বলতা নয়, ব্যবহারকারীদের অসতর্কতারও সুযোগ নেয়। তাই অনলাইনে কী শেয়ার করছেন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।অনলাইনে কোন বিষয়গুলোতে বেশি সতর্ক থাকতে হবে, কী ধরনের ভুল এড়িয়ে চলা উচিত এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন এসব বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রযুক্তিবিদ ও আইটি উদ্যোক্তা শিমুল শাহরিয়ার।
তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটকে কখনোই সম্পূর্ণ নিরাপদ জায়গা মনে করবেন না। আমরা অনেক সময় ভাবি, অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা কিংবা যে কোনো লিংকে প্রবেশ করা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইন্টারনেটে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে কোনো না কোনো ঝুঁকি জড়িয়ে থাকতে পারে।’প্রথমত, অপরিচিত কোনো লিংকে ক্লিক করবেন না। অনেক সময় আকর্ষণীয় অফার, পুরস্কার, চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা জরুরি বার্তার আড়ালে প্রতারণামূলক লিংক ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব লিংকে প্রবেশ করলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড কিংবা আর্থিক তথ্য চুরি হয়ে যেতে পারে। একইভাবে, মোবাইল ফোনে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের বাইরে থেকে অপরিচিত উৎসের অ্যাপ ইনস্টল করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এসব অ্যাপের আড়ালে ক্ষতিকর সফটওয়্যার থাকতে পারে, যা আপনার অজান্তেই ফোনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।দ্বিতীয়ত, অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
একই পাসওয়ার্ড সব জায়গায় ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ একটি অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড কোনোভাবে ফাঁস হয়ে গেলে অন্য অ্যাকাউন্টগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি যেখানে সম্ভব, দুই ধাপের নিরাপত্তাব্যবস্থা বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন।এই প্রযুক্তিবিদ বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে অনলাইনে যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত পরিসরে রাখুন। অর্থাৎ নিজের জীবনের প্রতিটি ঘটনা, অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। আপনি যত বেশি ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করবেন, একজন অপরাধীর জন্য আপনাকে চিহ্নিত করা তত সহজ হতে পারে।’ধরুন, আপনি পরিবার নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে গেছেন। সমুদ্রসৈকতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলেন।
এই একটি পোস্টের মাধ্যমে আপনি অপরিচিত অনেক মানুষকে জানিয়ে দিলেন যে আপনি এই মুহূর্তে বাড়িতে নেই, বরং বাড়ি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। কোনো অপরাধী যদি আপনার বাসার ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্যও জানে, তাহলে সে এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই বেড়ানোর ছবি তাৎক্ষণিকভাবে পোস্ট না করে ফিরে আসার পর শেয়ার করাই নিরাপদ।একই বিষয় প্রযোজ্য আমাদের ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষেত্রেও। আপনি শখ করে একটি দামি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, গয়না কিংবা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিস কিনেছেন। আনন্দের মুহূর্তে সেটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলেন। কিন্তু আপনি হয়তো বুঝতেই পারছেন না, এই পোস্টের মাধ্যমে অপরিচিত কারো কাছে আপনার এসব তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে।
এসব তথ্য অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে কেউ আপনার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পেতে পারে। ফলে আপনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধীদের সম্ভাব্য চিহ্নিত পরিণত হতে পারেন।আইটি উদ্যোক্তা শিমুল শাহরিয়ার বলেন, ‘এসব ঘটনাকে বলা হয় ‘অনলাইন নজর লাগা’। তাই আমার পরামর্শ হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করুন, আনন্দের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিন, নিজের অর্জন উদ্যাপন করুন কিন্তু সবকিছুর মধ্যে একটি সীমারেখা বজায় রাখুন। নিজের বাসার ঠিকানা, তাৎক্ষণিক অবস্থান, দৈনন্দিন চলাফেরার সময়সূচি, পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা মূল্যবান সম্পদের বিস্তারিত প্রকাশ করার আগে একবার ভেবে নিন।