প্রযুক্তি দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বদলে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রের চিত্র। যে কাজ একসময় করতে বড় একটি দলের প্রয়োজন হতো, এখন উন্নত এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তা সামলানো সম্ভব হচ্ছে অল্প কয়েকজন কর্মীর মাধ্যমেই। ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমানো এবং কাজের ধরন বদলে ফেলার প্রবণতা বাড়ছে। গুগল ও মাইক্রোসফটের পর এবার কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ দিচ্ছে মার্ক জুকারবার্গের সংস্থা মেটা। বিনিময়ে দেওয়া হবে আর্থিক সুবিধা। তবে এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই ব্যয় কমানোর কৌশল, নাকি এআইয়ের কারণে কর্মক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটা ফ্রান্সে কর্মরত কর্মীদের জন্য ‘ভলান্টারি এক্সিট অপশন’ বা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার একটি ব্যবস্থা চালু করছে। ফ্রান্সে সংস্থাটির কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩০০। তাদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন এই পরিকল্পনার আওতায় আসতে পারেন বলে জানা গেছে।
তবে কোন বিভাগের বা কোন পদে কর্মরত ব্যক্তিরা এই সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন। ৫ নভেম্বরের মধ্যে আগ্রহীদের আবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল।
এক্ষেত্রে কর্মীদের ওপর সরাসরি চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফ্রান্সের শ্রম আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে এবং ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করে এ ধরনের কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যায়। মেটার এই পরিকল্পনাও সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের বাইরে মেটা একই ধরনের উদ্যোগ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সংস্থাটির সাম্প্রতিক কর্মী ও প্রযুক্তি পরিকল্পনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে চাইছে তারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে মেটা প্রায় ৮ হাজার পদ বিলুপ্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। অন্যদিকে মে মাসে প্রায় ৭ হাজার কর্মীকে এআই-সম্পর্কিত কাজে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসে। অর্থাৎ, একদিকে কিছু পদ কমানোর পরিকল্পনা, অন্যদিকে এআই প্রযুক্তি পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য কর্মীদের নতুন দায়িত্বে যুক্ত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে শুধু এআইয়ের কারণে চাকরি হারানো হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর পুনর্গঠন, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং নতুন ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারের মতো বিষয়ও কর্মীসংখ্যা পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গ আগেই জানিয়েছেন, এআইয়ের উন্নতির ফলে এখন একজন কর্মী এমন কিছু প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারছেন, যেগুলোর জন্য আগে বড় দলের প্রয়োজন হতো। অর্থাৎ, এআই শুধু কাজের গতি বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে কর্মীদের দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার ধরনও বদলে দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমতে পারে। আবার এআই মডেল তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার মতো নতুন ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
এআইয়ের অগ্রগতি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ। যেসব কাজ নিয়ম মেনে বারবার করতে হয়, সেগুলোর অনেকটাই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কিছু পদ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে জানেন, এমন কর্মীদের চাহিদাও তৈরি হচ্ছে।
মেটার ফ্রান্সের উদ্যোগ তাই শুধু একটি সংস্থার কর্মীসংখ্যা কমানোর ঘটনা নয়; বরং প্রযুক্তি শিল্পে চলমান পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে শুধু অভিজ্ঞতা নয়, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একসময় যন্ত্র মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমিয়েছিল, আর এখন এআই মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্তনির্ভর কাজেও জায়গা করে নিচ্ছে। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সুযোগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বহু কর্মীর সামনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, মেটার এই সিদ্ধান্ত যেন তারই আগাম সংকেত।