গাজীপুর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে দালালদের দৌরাত্ম্যের শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। অভিযোগ রয়েছে, কার্যালয়টিতে মমিন নামের এক দালালের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে তাঁর ইশারা ছাড়া অনেক কাজই হয় না। ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট ও যানবাহনের মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবায় রয়েছে তাঁর নিয়ন্ত্রণ। তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালালচক্র। আর এসব কাজে তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করেন তাঁরই মেয়ে জামাতা নুরুল আমিন ও ভাগনে শাহীন হোসেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের হিসাব রাখা, অনলাইন আবেদনসহ বিভিন্ন কাজ তদারকি করেন তাঁরা দুজন। তাঁদের অধীনে কাজ করেন আরও একাধিক দালাল।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণে মমিনের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এবং বিআরটিএ কার্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মেয়ে জামাতা নুরুল আমিন, ভাগিনা শাহীন আফজাল, রুহুল ও কমল নামের আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে তাঁদের অবাধ চলাচল এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা বোর্ডকে কেন্দ্র করে মমিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ সময়ই তাঁর দেওয়া রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়া হয়। এ জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। প্রতি পরীক্ষায় এভাবে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। একটি বোর্ডে গড়ে অর্ধলক্ষাধিক টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। আর এসব টাকার ভাগ পান অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
গত ১৫টি পরীক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে মমিনের উপস্থিতি ও তৎপরতা দেখা গেছে। এ সময় তাঁকে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঘোরাফেরা করতে এবং পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে কানে কানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিতেও দেখা গেছে। এ জন্য তাঁদের কাছে দুই থেকে তিন হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ তাঁর দাবিকৃত অর্থ দেওয়ার পর পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন বলেও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কখনো কখনো পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করে নিজের মাধ্যমে আসা পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তরও বলে দেন মমিন। অথচ তিনি বিআরটিএর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। তারপরও কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর এমন অবাধ বিচরণে সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে তাঁকে দালাল হিসেবে চিহ্নিত করাও কঠিন।
একইভাবে আফজাল ও রুহুলের বিরুদ্ধেও রয়েছে দালালির অভিযোগ। বিআরটিএর বিভিন্ন কক্ষে তাঁদের নিয়মিত যাতায়াত করতে দেখা যায়। এ ছাড়া গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেন তাঁরা। এমনকি বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ সার্ভার ব্যবহারের সুযোগও তাঁদের হাতে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এমন অবস্থায় গাজীপুর বিআরটিএর সার্ভার কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, সিএনজি স্ট্যান্ডের চালক ও মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করেন কমল। ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট ও মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কাজের জন্য তিনি গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি সরকারি ফির বাইরে দুই থেকে তিন গুণ বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন। পরে সেখান থেকে নিজের অংশ রেখে বাকি অর্থ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আফজালের কাছে পৌঁছে দেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর বিআরটিএর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিতভাবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অসুস্থতার কথা জানান এবং প্রতিবেদকের কাছে দোয়া চান। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় দালাল মমিন, তাঁর সহযোগী রুহুল, আফজাল ও কমলের সঙ্গে। তবে অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না দিয়ে তাঁরা প্রতিবেদককে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিআরটিএর। অথচ সেই সেবা নিতে গিয়ে যদি গ্রাহকদের দালালনির্ভর হতে হয় এবং সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে দাপ্তরিক তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।