চাকরিতে যোগদানের পর প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করলে পরে বিধি সংশোধন করে সেই অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধনের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের থাকলেও নতুন বিধান ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠিত আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
একই সঙ্গে ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী আবেদনকারীদের পুরোনো প্রবিধান অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা ও আইনানুগ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এক মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাত উপসহকারী প্রকৌশলীর পদোন্নতি-সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১৯ আগস্ট এ রায় দেন। ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারসহ সাতজন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে বারিতে যোগদান করেন। পরে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়।
তৎকালীন ‘বারি প্রবিধানমালা, ২০১১’ অনুযায়ী, উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পাঁচ বছর চাকরি পূর্ণ হলে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির বিধান ছিল। রিট আবেদনকারী সাত প্রকৌশলীই ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরিকাল ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেন।
কিন্তু ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরকার ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রবিধানমালা, ২০২১’ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। নতুন প্রবিধানমালার ৩২ নম্বর ক্রমিকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদের ১০০ শতাংশ পদোন্নতির বিধান পরিবর্তন করে ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পদ পূরণের ব্যবস্থা করা হয়।
অন্যদিকে, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল শাখার উপসহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে শতভাগ পদোন্নতির কোটা বহাল রাখা হয়।
নতুন বিধানের ফলে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় নিজেদের অর্জিত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ তুলে ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট করেন ওই সাত প্রকৌশলী। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ আদালতে যুক্তি দেন, ২০২১ সালের প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই তার মক্কেলরা পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেছিলেন। ফলে পরে প্রবিধান সংশোধন করে তাদের পদোন্নতির সুযোগ কমিয়ে দেওয়া আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এতে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে বারির পক্ষে আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন যুক্তি দেন, ২০১১ সালের প্রবিধানমালা রহিত করে নতুন প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। রহিত বিধানের অধীনে পদোন্নতি দাবি করা যায় না। এছাড়া সিভিল শাখায় উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বিএসসি প্রকৌশলীদের সরাসরি নিয়োগের বিধান করা হয়েছে বলে তিনি আদালতে তুলে ধরেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ ও আক্তার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
উভয়পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, প্রবিধান সংশোধনের আগেই যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ২০২১ সালের নতুন প্রবিধানমালা ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আবেদনকারীরা ২০১১ সালের প্রবিধানমালার অধীনে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারের অধিকারী। পরে প্রবিধানে পরিবর্তন এনে তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
হাইকোর্ট আরও বলেন, নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে নির্ধারিত চাকরিকাল, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণকারী আবেদনকারীদের পদোন্নতির বিষয়টি পুরোনো প্রবিধানমালা অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে। নতুন করে আরোপিত কোনো শর্তের কারণে তাদের আগে অর্জিত যোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
রিটের রুল যথাযথ বিবেচনায় নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন, ২০২১ সালের প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী আবেদনকারীদের ‘বারি প্রবিধানমালা, ২০১১’-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে পদের শূন্যতা, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত অন্যান্য আইনানুগ শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত সাপেক্ষে আগামী এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করেছেন, চাকরির বিধিমালা সংশোধনের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের থাকলেও সেই সংশোধন ব্যবহার করে নতুন বিধানকে অতীত থেকে কার্যকর দেখিয়ে আগে অর্জিত আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।