হজরত মুসার (আ.) আমলে বনি ইসরাইলের মধ্যে এক ব্যক্তি খুন হয়েছিল। কে তাকে খুন করেছে, তা নিয়ে লোকজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলো। তারা পরস্পরের ওপর দোষ চাপাতে লাগল। এক পর্যায়ে তারা হজরত মুসার (আ.) কাছে এসে বলল, আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসা করে আমাদের জানান, কে এই খুন করেছে। তখন আল্লাহ তাদের একটি গাভি জবাই করার নির্দেশ দিলেন। লোকজন প্রথমে ভেবেছিল মুসা (আ.) রসিকতা করে এ কথা বলেছেন। তারা বলল, ‘আপনি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন?’ মুসা (আ.) বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হই।’
এরপর তারা বলল, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে জিজ্ঞাসা করুন, গাভিটি কেমন হবে।’ মুসা (আ.) জানালেন, গাভিটি খুব বুড়োও হবে না, আবার একেবারে বাছুরও হবে না বরং মাঝবয়সী হবে। কিন্তু এতটুকু জানার পরও তারা গাভি জবাই করতে রাজি হলো না। তারা আবার বলল, ‘গাভির রং কী হবে, তা জিজ্ঞাসা করুন।’ মুসা (আ.) জানালেন, গাভির রং হবে গাঢ় হলুদ। সেটি দেখতে খুব সুন্দর হবে, যা মানুষের মন কাড়বে।
তারপরও তাদের প্রশ্ন শেষ হলো না। তারা বলল, ‘গাভিটি কেমন হবে, তা আমাদের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে আরও জিজ্ঞাসা করুন। আল্লাহ চাইলে আমরা গাভির খোঁজ পেয়ে যাব।’
মুসা (আ.) জানালেন, গাভিটি এমন হবে, যা দিয়ে জমি চাষ করা হয় না, ক্ষেতে পানিও দেওয়া হয় না। সেটি হবে সম্পূর্ণ সুস্থ, শরীরে কোনো দাগ থাকবে না। এবার তারা বলল, ‘এখন আপনি যথাযথ বিবরণ দিয়েছেন।’
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত এরকম গাভি পাওয়া গেল। সেই গাভি জবাই করা হলো। এরপর আল্লাহ তাদের নির্দেশ দিলেন, গাভির গোশতের টুকরা দিয়ে নিহত ব্যক্তিকে আঘাত করতে। তারা তা-ই করল। এভাবেই আল্লাহ মৃতকে জীবিত করে তার কুদরতের নিদর্শন দেখালেন। (সুরা বাকারা: ৬৭-৭৩)
কোরআনে এই ঘটনা বর্ণনার পেছনে মূলত দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, আল্লাহর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শিক্ষা দেওয়া। আল্লাহ যখন কোনো নির্দেশ দেন, তখন তা নিয়ে অযথা প্রশ্ন না করে পালন করাই মুমিনের পরিচয়। কিন্তু বনি ইসরাইল সহজ একটি নির্দেশ মেনে নেওয়ার পরিবর্তে একের পর এক প্রশ্ন করে বিষয়টিকে নিজেদের জন্য কঠিন করে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বাস্তবতা তুলে ধরা।
কিন্তু মানুষ এই ঘটনার মূল শিক্ষা থেকে সরে গিয়ে এর সঙ্গে নানা ধরনের কেচ্ছা-কাহিনি জুড়ে দিয়েছে। যেমন বলা হয়:
বনি ইসরাইলের এক সৎ ও পরহেজগার বৃদ্ধের একটি ছোট বাছুর ছিল। মৃত্যুর আগে তিনি বাছুরটিকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! এই বাছুরটি তোমার জিম্মায় রেখে গেলাম। আমার এতিম সন্তান বড় হলে যেন এটি তার কাজে আসে।’
বৃদ্ধের ছেলে বড় হয়ে সৎ ও মাতৃভক্ত যুবক হলো। সে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করত। উপার্জনের এক-তৃতীয়াংশ সদকা করত, এক-তৃতীয়াংশ মায়ের জন্য রাখত, আর বাকি অংশ নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করত। একদিন তার মা বাবার রেখে যাওয়া বাছুরটির কথা জানিয়ে তাকে জঙ্গল থেকে সেটি ফিরিয়ে আনতে বললেন।
যুবকটি জঙ্গলে গিয়ে আল্লাহর দোহাই দিয়ে ডাকতেই বাছুরটি তার সামনে হাজির হলো। সেটিকে নিয়ে ফেরার পথে বাছুরটি বলে উঠল, ‘তুমি আমার পিঠে চড়ে বসো। তাহলে তোমার কষ্ট কম হবে।’ যুবক বলল, ‘আমার মা আমাকে তোমার গলার দড়ি ধরে নিয়ে আসতে বলেছেন, পিঠে চড়তে বলেননি।’ তখন বাছুরটি তার মাতৃভক্তির প্রশংসা করে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করতে লাগল।
বর্ণনায় আরও বলা হয়, মুসার (আ.) কাছে বারবার প্রশ্ন করে বনি ইসরাইল যখন গাভি জবাইয়ের শর্ত কঠিন করে ফেলল, তখন সারাদেশে খুঁজেও ওই রকম কোনো গাভি পাওয়া গেল না। এভাবে ৪০ বছর খোঁজার পর ওই এতিম যুবকের কাছে গাভি পাওয়া গেল। তারা গাভিটি কিনতে চাইলো। এ ব্যাপারে সেই যুবক মায়ের পরামর্শ নিতে গেলেন। তার মা প্রথমে যে দাম বলেছিলেন, তা অল্প ছিল। কিন্তু ক্রেতার বেশে আসা এক ফেরেশতা ক্রমাগত দাম বাড়াতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত বনি ইসরাইলকে গাভিটির ওজনের সমপরিমাণ সোনা দিয়ে সেটি কিনতে হলো। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, গাভির চামড়া ভর্তি সোনা দিতে হয়েছিল। এভাবে যুবক ও তার মা রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন।
তো, গল্পটি মূলত ইহুদিদের লোককাহিনি থেকে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। রাসুল (সা.) থেকেও এই গল্পের সত্যতা মেলে না। তাই একে নিশ্চিত সত্য বা মিথ্যা বলার সুযোগ নেই।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা যে অংশটুকু শিক্ষণীয় মনে করেছেন, সেটুকুই আমাদের জানিয়েছেন। তাই কোরআনের বর্ণনার বাইরে গিয়ে এসব খুঁটিনাটি নিয়ে অযথা খানাতল্লাশি করার প্রয়োজন নেই। বরং কোরআনের মূল বক্তব্য বোঝা এবং সেই শিক্ষা গ্রহণ করাই আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।