বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহের জীবন পর্যালোচনা করে অনেক কিছু শেখার আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। হান্নান শাহর দশম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (১২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় তিনি হান্নান শাহের সাহসিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, রাজনৈতিক জীবনের সততা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
রিজভী বলেন, হান্নান শাহ সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। পরে রাজনীতিতে এসে মন্ত্রী হয়েছেন এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন। রাজনীতিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তার বিরুদ্ধে কেউ অনৈতিক বা অনিয়মতান্ত্রিক কাজের অভিযোগ তুলে ধরতে পারবেন না। এটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, হান্নান শাহের অন্তরে কোনো কালিমা বা কুটিলতা ছিল না। কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তাৎক্ষণিক ধমক দিতেন, কিন্তু দুই ঘণ্টা পরই তা ভুলে যেতেন। আবার সেই ব্যক্তিকেই কাছে টেনে নিতেন। এটাই ছিল তার বৈশিষ্ট্য।
হান্নান শাহ একটি ঐতিহ্যবাহী ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার বাবা ফকির আবদুল মান্নান মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি মন্ত্রী হিসেবেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঢাকা জেলার একজন খ্যাতিমান আইনজীবী ছিলেন। এমন একটি আলোকিত পরিবারের সন্তান হিসেবে হান্নান শাহের আচরণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আভিজাত্যের বৈশিষ্ট্য দেখা যেত।
রিজভী বলেন, দুঃসময়ে দলের হাল ধরা, কথা বলা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে হান্নান শাহ ছিলেন সাহসের প্রতীক। শুধু এক-এগারোর সময় নয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি হওয়ার বিভিন্ন সময়েও তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।
হান্নান শাহের সামরিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, বগুড়া সেনানিবাস প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহের বিভিন্ন ঘটনা মোকাবিলা এবং সেনাবাহিনীকে সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি হান্নান শাহেরও অবদান ছিল।
তিনি বলেন, হান্নান শাহ নিজের মুখে একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। বগুড়া সেনানিবাসে ট্যাংক রেজিমেন্টের সদস্যরা বিদ্রোহ করলে তিনি হাতে একটি ড্যাগার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার পেছনে অনেক লোক ও ভারী অস্ত্র রয়েছে—এমন ধারণা থেকে বিদ্রোহী সৈন্যরা ভয়ে আত্মসমর্পণ করে। এ ঘটনা তার সাহসিকতার পরিচয় বহন করে।
রিজভী আরও বলেন, হান্নান শাহের জীবনের নানা ঘটনা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অবস্থান এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দৃঢ়ভাবে অংশ নেওয়ার মানসিকতা তাকে দলের নেতাকর্মীদের কাছে সাহস ও বীরত্বের প্রতীকে পরিণত করেছিল।
হান্নান শাহের কর্তব্যনিষ্ঠার আরেকটি উদাহরণ তুলে ধরে রিজভী বলেন, চাকরি ছেড়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
আশির দশকের আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদ নির্বাচন বর্জনের আন্দোলন চলাকালে হান্নান শাহসহ বিএনপির অনেক নেতা গ্রেফতার হয়েছিলেন। হান্নান শাহকে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়। তখন কারাগারে থেকেও তিনি আন্দোলনের কর্মীদের কাছে নির্দেশনা পাঠাতেন।
রিজভী বলেন, একদিন অন্ধকারে গোপন বৈঠক করার সময় তাদের কাছে একটি চিরকুট আসে। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন, গোয়েন্দা বিভাগের কেউ বৈঠকের খবর পেয়ে গেছেন। কিন্তু চিরকুট বহনকারী ব্যক্তি জানান, তিনি কারাগারে চাকরি করতেন এবং হান্নান শাহ তাকে এটি পৌঁছে দিতে বলেছেন।
চিরকুটে সাংকেতিক ভাষায় ‘স্টপ রাইস, স্টপ চিকেন’ লেখা ছিল। এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় চাল ও মুরগি পরিবহন বন্ধ করার চেষ্টা এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান বক্তা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থেকেও আন্দোলনের কর্মীদের কাছে এভাবে নির্দেশনা পাঠানো ছিল হান্নান শাহের কর্তব্যনিষ্ঠার একটি উদাহরণ।
রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে হান্নান শাহকে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। বয়স আশির বেশি হওয়ার পরও তাকে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু যত দিন তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছেন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, তত দিনই সাহসের সঙ্গে কথা বলেছেন।
হান্নান শাহের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কারাগারে থাকার সময় তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তা সত্ত্বেও হান্নান শাহ নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।
স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন। এ সময় বক্তব্য দেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. চৌধুরী ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী, সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, বিএনপির গাজীপুর জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল, বিএনপি নেতা মো. জেড খান রিয়াজ উদ্দিন নসু, অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, হুমায়ুন কবীর খান ও ওমর ফারুক সাফিনসহ আরও অনেকে।