বাংলা নাটকের ইতিহাসে কিছু চরিত্র সময় পেরিয়েও দর্শকের মনে অমলিন হয়ে থাকে। তেমনই একটি চরিত্র ‘বাকের ভাই’। ১৯৯৩ সালে প্রচার হওয়া হুমায়ূন আহমেদের লেখা জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর চরিত্র এটি। চরিত্রটি বিনা অপরাধে ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছিল। সে নিয়ে দর্শক আন্দোলন করতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
জনশ্রুতি রয়েছে যে, বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ আসার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং মানুষের আবেগ দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নাটকটির নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ বা প্রযোজক বরকতউল্লাহর কাছে ফোন করে ফাঁসি না দেওয়ার বা নাটকের পরিণতি পরিবর্তন করার অনুরোধ করেছিলেন। তবে লেখক হুমায়ূন আহমেদ তার নিজস্ব গল্প ও চিত্রনাট্যের মূল পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি এবং প্রধানমন্ত্রী বা কারও অনুরোধ রাখেননি। তিনি নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির দৃশ্যই প্রচার করেছিলেন।
নাটকে বাকের ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসায় আজও কালজয়ী হয়ে আছেন অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। পর্দার সেই বাকের ভাইয়ের মতো তিনিও আজ কারাবন্দী। আজ ৩১ অক্টোবর তার জন্মদিন। জীবনের ৮০ বছরে পা রাখা এই অভিনেতার দিন কাটছে কারাগারে।
পর্দার বাকের ভাই ফাঁসিতে ঝুলে জীবন থেকে মুক্তি পেলেও বাস্তবের বাকের ভাই বৃদ্ধ বয়সে দিন কাটাচ্ছেন কারাবন্দী হয়ে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কারাগারেই থাকেন, কারাগারই তার ঠিকানা।
১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর নীলফামারী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান নূর। তার বাবা আবু নাজিম মো. আলী এবং মা আমিনা বেগম। শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের প্রথম সময় কেটেছে উত্তরবঙ্গের এই মফস্বল শহরেই।
অভিনয়জীবনের শুরু থিয়েটারের মঞ্চ থেকে। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। মঞ্চের অভিজ্ঞতা থেকেই ধীরে ধীরে টেলিভিশন নাটকে পরিচিতি পান। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকের শফিক, ‘অয়োময়’-এর ছোট মির্জা এবং ‘নক্ষত্রের রাত’-এর হাসান চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা এনে দেয় ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটি।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা ও পরিচালনায় ‘আগুনের পরশমনি’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান নূর। নাটক ও চলচ্চিত্র- দুই মাধ্যমেই নিজের অভিনয়দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন এই অভিনেতা। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নীলফামারী থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
তবে গেল ২০২৪ সাল থেকে তার দিনরাত কাটছে কারাবন্দী হয়ে। সে বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
একসময় টেলিভিশনের পর্দায় বাকের ভাই হয়ে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। সেই চরিত্র আজও বাংলা নাটকের দর্শকদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। কিন্তু জীবনের ৮০তম জন্মদিনে এই অভিনেতার ঠিকানা কারাগার।