আফগান শরণার্থীদের নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দেশটিতে আটক কয়েক ডজন আফগান অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীকে পাকিস্তানে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য বিশেষ উড়োজাহাজের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। অধিকারকর্মী ও আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, আগামী সোমবার (২ নভেম্বর) থেকেই এই বহিষ্কার কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
তবে এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, পাকিস্তান থেকে এসব আফগানকে আবার তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হতে পারে। সেখানে তাদের নির্যাতন, কারাবন্দি কিংবা নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বহিষ্কারের মুখে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে এমন আফগানও রয়েছেন, যাদের পরিবারের সদস্যরা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরব্যাপী যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
আফগানিস্তানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কয়েক দশক ধরে দেশটির নাগরিকদের আশ্রয় দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষ করে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হাজার হাজার আফগান দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পান।
কিন্তু গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানসহ বিভিন্ন দেশের শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করেন। একই সঙ্গে অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতি গ্রহণ করে তার প্রশাসন।
এবার যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগানদের পাকিস্তানে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, পাকিস্তান এসব মানুষকে বেশিদিন নিজেদের ভূখণ্ডে রাখবে না। শেষ পর্যন্ত তাদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার সংগঠন আফগানইভ্যাকের সভাপতি শন ভ্যানডাইভার বলেন, পাকিস্তানে পাঠানো আফগানদের শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের অজানা থাকার কথা নয়।
তার অভিযোগ, পাকিস্তানের মাধ্যমে এসব মানুষকে শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে পাকিস্তান।
তবে ২০২৩ সাল থেকে দেশটি আফগান শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। এর ফলে লাখ লাখ আফগানকে পাকিস্তান ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়। অনেককে জোর করে ফেরত পাঠানো হয়।
অন্যদিকে আফগানিস্তানেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।
দেশটিতে একাধিক মানবিক সংকট চলছে। ব্যাপক অপুষ্টি, প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এবং তালেবানের কঠোর নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নারীদের অধিকার ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
ভ্যানডাইভারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানে পাঠানো আফগানদের তালেবান সন্দেহের চোখে দেখবে। তাদের নির্যাতন, কারাবন্দি কিংবা আরও গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে।
আফগানইভ্যাক জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪টি অভিবাসন আটককেন্দ্র থেকে অন্তত ৮০ জন আফগানকে লুইজিয়ানায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে ১৯ জনের কোনো আইনজীবী নেই বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি শন ভ্যানডাইভার।
তার ধারণা, লুইজিয়ানার সেন্ট্রাল লুইজিয়ানা আইসিই প্রসেসিং সেন্টারে কয়েকশ আফগানকে আটক রাখা হয়ে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিইর (ICE) আটক ব্যক্তিদের বহিষ্কারের আগে এই কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বহিষ্কারের তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণির অভিবাসী। এর মধ্যে রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ রয়েছে, যাদের আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হয়েছে এবং যাদের সাময়িক সুরক্ষার মর্যাদা বাতিল করা হয়েছে।
তবে তাদের সবার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কয়েকজনের আশ্রয়ের আবেদন এখনো বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন ভ্যানডাইভার।
বহিষ্কারের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন আটক আফগানদের পরিবারের সদস্যরা।
এমনই একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক শার্লট। তার আফগান স্বামী ২০২৫ সালের শুরুর দিক থেকে আইসিইর হেফাজতে রয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে স্বামীর পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
শার্লট জানান, তার স্বামীর আশ্রয়ের আবেদন প্রায় নয় বছর ধরে ঝুলে আছে। গত বছর একটি ঘটনায় স্বামীকে আটক করা হয়।
তার দাবি, স্বামীর বৈধ ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও সে সময় তার কাছে কাজের অনুমতিপত্র ছিল না। পরে তাকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেওয়া হয়।
স্বামীকে দেখতে নিয়মিত যাতায়াতের সুবিধার জন্য শার্লট নিজের বাড়ি বিক্রি করে ছয় বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মেরিল্যান্ডে চলে যান।
তিনি বলেন, স্বামীর সঙ্গে দেখা করার সময় তাদের মাঝখানে কাচের দেয়াল থাকত। ছেলেকে একবারও বাবাকে জড়িয়ে ধরতে দেওয়া হয়নি।
শার্লট বলেন, ‘প্রতিবার আমরা শুধু বসে কেঁদেছি।’
এখন তার স্বামীকে পেনসিলভানিয়া থেকে লুইজিয়ানায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় দেখা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বামীকে পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তানে পাঠানো হতে পারে—এমন আশঙ্কায় ভেঙে পড়েছেন তিনি।
শার্লট বলেন, ‘আমি ভীষণ আতঙ্কিত। তিনি নিরাপদ থাকবেন কি না, তা জানি না। তাকে কারাগারে আটকে রাখা হলেও আমার কিছু করার থাকবে না।’
আফগান শরণার্থীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা।
তাদের মতে, যেসব আফগান একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের এভাবে বিতাড়িত করলে ভবিষ্যতে অন্য দেশের মানুষও মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
এতে ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের সময় দেশটি থেকে বহু মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা অনেক আফগানও ছিলেন।
তবে ২০২৫ সালে ওয়াশিংটনে এক বন্দুক হামলায় ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্য নিহত এবং আরেকজন গুরুতর আহত হওয়ার পর আফগান অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর হয় ট্রাম্প প্রশাসন।
ওই হামলার সন্দেহভাজন ছিলেন একজন আফগান নাগরিক। তিনি আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
আফগানদের পাকিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি রয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
তবে মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, পাকিস্তান সরকারের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ উড়োজাহাজ দেশটিতে অবতরণ করতে পারবে না।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে হোয়াইট হাউজ। বিভাগটির মুখপাত্র নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বহিষ্কার কার্যক্রমের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও এ বিষয়ে নতুন কোনো ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনে দেশটির দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনবিসি নিউজের পাশাপাশি ব্লুমবার্গ ও নিউইয়র্ক টাইমসও আফগানদের পাকিস্তানে পাঠানোর প্রস্তুতির খবর প্রকাশ করেছে।
আফগান শরণার্থীদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
কাতারে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত ক্যাম্প আস সাইলিয়াহতে এক হাজারের বেশি আফগান অবস্থান করছেন। তাদের অনেকেরই যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসনের অনুমোদন রয়েছে।
আফগানইভ্যাকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে ওই ক্যাম্পে ২৮৭ জন পুরুষ, ৩১৯ জন নারী ও ৪৩৩ জন শিশু ছিলেন।
তাদের অনেকেই আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের ১৫০ জন আফগান স্বজনও রয়েছেন।
আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, ৩১ মার্চের মধ্যে ক্যাম্পটি থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন ক্যাম্পটি বন্ধের সময়সীমা আরও নয় মাস পিছিয়ে দেয়।
এর আগে এসব আফগানকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনা করেছিল প্রশাসন।
আফগানইভ্যাকের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যস্ততার মধ্যে আফগানদের বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা না হয়।
সংগঠনটির ভাষ্য, কোথায় এসব উড়োজাহাজ অবতরণ করবে, তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। কারণ, সেখানে পৌঁছানোর পর এসব মানুষের কী পরিণতি হতে পারে, তা প্রশাসন জানে।
সূত্র: এনবিসি নিউজ