ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি, ঠান্ডা লাগা আর গলা ব্যথার সমস্যা বেশ পরিচিত। এর সঙ্গে অনেকেরই দেখা দেয় স্বর ভেঙে যাওয়া বা গলা বসে যাওয়ার সমস্যা। সকালে ঘুম থেকে উঠে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়, গলার স্বাভাবিক আওয়াজ যেন হারিয়ে গেছে। কারো কণ্ঠস্বর হয়ে যায় কর্কশ, কারো আবার কথা বলতেই কষ্ট হয়। কিন্তু ঠান্ডা লাগলে কেন এমন হয়? এর পেছনে রয়েছে আমাদের স্বরযন্ত্রের বিশেষ একটি প্রক্রিয়া।
আমাদের গলার ভেতরে রয়েছে দুটি সূক্ষ্ম পেশিবহুল টিস্যু, যেগুলোকে বলা হয় ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রী। ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা বাতাস এই স্বরতন্ত্রী দুটির মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় সেগুলোতে কম্পন তৈরি করে। এই কম্পনের মাধ্যমেই উৎপন্ন হয় কণ্ঠস্বর। স্বরতন্ত্রীর কম্পনের গতি ও ধরন অনুযায়ী কণ্ঠস্বরের স্বরভঙ্গি ও আওয়াজের পরিবর্তন ঘটে।
সাধারণ সর্দি-কাশির পেছনে থাকা ভাইরাস অনেক সময় গলা ও স্বরযন্ত্রে প্রদাহ তৈরি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ল্যারিঞ্জাইটিস। প্রদাহের কারণে স্বরতন্ত্রী ফুলে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে কম্পিত হতে পারে না। ফলে কণ্ঠস্বরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। গলা কর্কশ শোনাতে পারে, স্বর নিচু হয়ে যেতে পারে, এমনকি সাময়িকভাবে কথা বলার সময় আওয়াজও বের হতে চায় না।
সর্দি-কাশির সময় নাক বন্ধ থাকা, কাশি এবং গলার পেছনে শ্লেষ্মা জমার সমস্যাও স্বরতন্ত্রীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বারবার কাশি দেওয়া বা গলা খাঁকারি দেওয়ার ফলে গলার অস্বস্তি আরও বাড়ে।
ঠান্ডা আবহাওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। ঘরের ভেতরে হিটার বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহারেও বাতাস শুষ্ক হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে গলা আরও শুকিয়ে যেতে পারে। এতে কথা বলার সময় অস্বস্তি তৈরি হয় এবং স্বর বসে যাওয়ার সমস্যা বাড়তে পারে।
এছাড়া অ্যালার্জি, সাইনাসের সমস্যা, ধূমপান, অতিরিক্ত কথা বলা কিংবা দীর্ঘক্ষণ উচ্চস্বরে কথা বলাও স্বরতন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে শুধু ঠান্ডা লাগাই নয়, আরও নানা কারণে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
স্বর বসে গেলে প্রথমেই গলার ওপর চাপ কমানো জরুরি। কয়েকটি অভ্যাস এ ক্ষেত্রে স্বস্তি দিতে পারে।
গলা বসে গেলে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা এড়িয়ে চলুন। জোরে কথা বলা, চিৎকার করা কিংবা ফিসফিস করে কথা বলাও স্বরতন্ত্রীর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই স্বাভাবিক স্বরে যতটা সম্ভব কম কথা বলুন।
সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করলে গলা আর্দ্র থাকে। কুসুম গরম পানি বা উষ্ণ পানীয় গলার অস্বস্তি কমাতে আরাম দিতে পারে।
এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে গলার অস্বস্তি ও ব্যথায় স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। তাই দিনে অন্তত দু-তিনবার গার্গল করা উচিত। তবে গার্গল করার সময় পানি গিলে ফেলা যাবে না।
কুসুম গরম পানিতে মধু মিশিয়ে পান করলে কাশির অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে। আদা চা, মধু-লেবুর রস বা তুলসি পাতার রস গলাকে আরাম দিতে বিশেষ সাহায্য করে।
তবে খুব গরম পানীয় এড়িয়ে চলুন। কথা কম বলে ভোকাল কর্ডকে কিছুদিন বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন।
ধূমপান, ধুলাবালি ও অন্যান্য বিরক্তিকর উপাদান স্বরতন্ত্রীর প্রদাহ বাড়াতে পারে। তাই এসব থেকে দূরে থাকা ভালো।
সাধারণ সর্দি-কাশির কারণে গলা বসে গেলে অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে স্বর বসে যাওয়ার সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা সঙ্গে তীব্র গলাব্যথা, জ্বর বা শ্বাসকষ্ট থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শ্বাস নিতে বা গিলতে অসুবিধা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
গলা বসে যাওয়াকে তাই কেবল সাধারণ ঠান্ডার সমস্যা ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। স্বরতন্ত্রীর বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাই কণ্ঠস্বরের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে সহায়তা করতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, মায়ো ক্লিনিক