বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম, আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি শাইখ মাহমুদুল হাসানের মিশর সফরকে কেন্দ্র করে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর মধ্যে ইলমি সম্পর্ক, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সফরকালে মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি কওমি শিক্ষার্থীদের সংগঠন আল-আজহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি হাদিসের ইজাযত প্রদান ও গ্রহণ এবং আল-আজহারের শিক্ষা কার্যক্রম পরিদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নেন।
সফরসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ দুই দেশের ইসলামি শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও জ্ঞানভিত্তিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
মিশরে পৌঁছানোর পর শাইখ মাহমুদুল হাসানকে মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘আল-আজহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আয়োজকদের এ সম্মাননা গ্রহণ করেন।
মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার এ যোগাযোগ প্রবাসে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সৌজন্য বিনিময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আলেমদের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি শিক্ষাবিদদের সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে সহায়ক হতে পারে।
শাইখ মাহমুদুল হাসানের মিশর সফরের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে ছিল হাদিসের ইজাযত প্রদান ও গ্রহণ। সফর সংশ্লিষ্ট সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এশীয় শিক্ষার্থীদের হাদিসের ইজাযত প্রদান করেন। পাশাপাশি আল-আজহারের বিশিষ্ট শিক্ষক ড. আবদুল ফাত্তাহ আস-সুবহীর সঙ্গে তার ইজাযত বিনিময় হয়। এ সময় তিনি তাকে ইজাযত প্রদান করেন এবং তার কাছ থেকেও ইজাযত গ্রহণ করেন।
ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে হাদিসের ইজাযত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে হাদিস পাঠ, বর্ণনা ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞানগত সংযোগ এবং সনদের ধারাবাহিকতা রক্ষার ঐতিহ্য বহন করা হয়। যুগে যুগে মুহাদ্দিস ও ইসলামি শিক্ষাবিদদের মধ্যে এ ধরনের ইজাযত বিনিময় জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
সে বিবেচনায় দুই শিক্ষাবিদের মধ্যে ইজাযত বিনিময়কে সফরের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি ঐতিহ্যভিত্তিক ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের আলেমদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্বও তুলে ধরে।
মিশরে অবস্থানকালে শাইখ মাহমুদুল হাসান আল-আজহারের শিক্ষা ও কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সফরসংশ্লিষ্ট বর্ণনায় এ পরিদর্শনকে আল-আজহার এবং বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা গুলোর মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে।
মিশরের আল-আজহার মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, হাদিসচর্চা এবং ইসলামি জ্ঞান বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিক্ষাপদ্ধতি, পাঠ্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পার্থক্য থাকলেও ইসলামি জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
এ ধরনের যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হলে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী পর্যায়ে মতবিনিময় এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা দুই দেশের শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় রূপ দিতে হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আগ্রহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন। শাইখ মাহমুদুল হাসানের এ সফর সেই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ও ভাবনার একটি উপলক্ষ তৈরি করেছে।
শাইখ মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তার জন্ম ১৯৫০ সালের ৫ জুলাই ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার চরখরিচা গ্রামে। তার পিতার নাম গালিমুদ্দিন আহমদ এবং মাতার নাম ফাতেমা রমজানী।
শৈশব থেকেই ইসলামি শিক্ষার প্রতি অনুরাগী মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহের বিভিন্ন মাদরাসায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি ঢাকার জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগে অধ্যয়ন করেন। উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার জন্য পাকিস্তানের জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় ভর্তি হন। সেখানে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুহাদ্দিস মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নুরীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান।
কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা ও ধর্মীয় জ্ঞান বিস্তারে অবদান রেখে চলেছেন। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার মহাপরিচালক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি এবং আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি গুলশান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব এবং মজলিসে দাওয়াতুল হক বাংলাদেশের আমীর হিসেবেও পরিচিত।
তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘তাফসীরে বুরহানুল কুরআন’ ও ‘আর রদ্দুল জামিল’। দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবা, ইসলামি জ্ঞানচর্চা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রচারের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন।
শাইখ মাহমুদুল হাসানের মিশর সফর কেবল একজন বিশিষ্ট আলেমের বিদেশ সফর নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামি শিক্ষাঙ্গনের সঙ্গে বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাধারার যোগাযোগের গুরুত্বও সামনে এসেছে।
জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিনয়, উদারতা এবং ভিন্ন শিক্ষাপরিবেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ একজন শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন দেশের আলেম ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ পান।
আল-আজহার ও বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হলে তা ইসলামি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা।
সব মিলিয়ে, শাইখ মাহমুদুল হাসানের মিশর সফর দুই দেশের ইসলামি শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এ যোগাযোগ ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপ নেয়।