কোরআনে হজরত ইউসুফের (আ.) ঘটনাকে ‘আহসানুল কাসাস’ বা সর্বোত্তম ঘটনা বলা হয়েছে। এতে আছে একজন নবীর জীবনে আসা কঠিন পরীক্ষা, সংগ্রাম, ধৈর্য ও সবশেষে সফলতা লাভের গল্প। একই সাথে এতে আছে আরেকজন নবীর জন্য সান্ত্বনা ও আশ্বাস। তাই এই ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের এর অন্তর্নিহিত শিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে।
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে হজরত ইউসুফের (আ.) ঘটনাকে কেবল একটি প্রেমকাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ইউসুফের সৌন্দর্য, জুলেখার আকর্ষণ, এবং বিরহের বর্ণনাই সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। এমনকি কোরআন ও হাদিসে নেই এমন অনেক কিছুই এর সাথে যুক্ত হয়। যেমন জুলেখার যৌবন ফিরে পাওয়া এবং হজরত ইউসুফের (আ.) সাথে তার বিবাহ হওয়া। অথচ কোরআনে এই ঘটনাকে মোটেও প্রেমকাহিনি হিসাবে উপস্থাপন করা হয়নি। যেই জুলেখাকে জড়িয়ে নানা কাহিনি বানানো হয়েছে, তার নামটাও বলা হয়নি। আমরা মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে এমন জিনিস নিয়ে মজে থাকি, যা একদিকে যেমন একজন পয়গম্বরের মর্যাদা লঙ্ঘন, অন্যদিকে কোরআন থেকে আমাদের দূরে সরে যাওয়া লক্ষণ।
প্রকৃতপক্ষে হজরত ইউসুফের (আ.) কাহিনির উদ্দেশ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বিষয় শিক্ষা দেওয়া। এর মধ্যে মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির ‘যেভাবে কোরআন পড়া কোরআনের দাবি’ গ্রন্থে পাঁচটি শিক্ষা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো:
১. আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ: জুলেখা হজরত ইউসুফকে (আ.) অনৈতিক কাজে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। ইউসুফ (আ.) তখন একদম নওজোয়ান ছিলেন, আর জুলেখাও যথেষ্ট সুন্দরী ছিল। কিন্তু তিনি নিজের আবেগ ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন। (সুরা ইউসুফ: ২৩–২৪)
২. আমানতদারিতা: যে আজিজে মিশর তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, ইউসুফ (আ.) তার বিশ্বাসের আমানতের খেয়ানত করেননি, তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তার বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি হননি। কোরআনে এই বিষয়টি এভাবে এসেছে, ‘তিনি (ইউসুফ) বললেন, আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি (আজিজে মিশর) আমার মনিব, তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে স্থান দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’ (সুরা ইউসুফ: ২৩) এর মানে, তার কাছে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার চেয়ে আমানতের মর্যাদা বড় ছিল।
৩. নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা: অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণে কারাবাসের হুমকি দেওয়া হয়। জুলেখা বলেছিলেন, ‘তাকে যে কাজ করতে বলছি তা যদি না করে, তাহলে অবশ্যই তাকে কারাবন্দি করা হবে, এবং অবশ্যই অবশ্যই তাকে অসম্মান করা হবে।’ (সুরা ইউসুফ: ৩২) কিন্তু ইউসুফ (আ) তার উত্তরে কী বললেন? তিনি বললেন, ‘হে আমার রব, এরা আমাকে দিয়ে যে কাজ করাতে চাচ্ছে তার চাইতে কারাগারই আমার কাছে প্রিয়।’ (সুরা ইউসুফ: ৩৩) নীতির প্রশ্নে তিনি কোনো আপস করেননি।
৪. প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কাজ চালিয়ে যাওয়া: তাকে যখন জেলখানায় বন্দি করা হলো, সেই প্রতিকূল অবস্থাতেও তিনি নিজের দায়িত্ব ভুলে যাননি। তিনি সেখানেই দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করে দিলেন। সহবন্দিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা আমাদের কাজ নয়।’ আরও বলেন, ‘সাথিগণ, তোমরা নিজেরাই ভেবে দেখো, ভিন্ন ভিন্ন বহু সংখ্যক রব ভালো, না এক আল্লাহ, যিনি সবার ওপর বিজয়ী।’ তারপর বলেন, ‘হুকুম একমাত্র আল্লাহর। তার হুকুম-তোমরা তাকে ছাড়া আর কারুর এবাদত করবে না। এটিই সরল সঠিক জীবন পদ্ধতি।’ (সুরা ইউসুফ: ৩৮-৪০)
৫. বিপদে দায়িত্ব থেকে সরে না যাওয়া: নিজের উদ্দেশ্য ত্যাগ না করা, এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্বাধীনতা জরুরি নয়, বরং সর্বাবস্থায় সামনে এগিয়ে যেতে হয়। এই কাহিনি এই মহান শিক্ষাই দেয়। এই কারণেই তিনি গোলামির জীবন থেকে উত্তীর্ণ হন। আল্লাহর হুকুম পালনে অটুট ছিলেন বলেই তিনি পরাধীন থেকে স্বাধীন হন। তাই মুক্ত হওয়ার পর তিনি বলেন, ‘হে আমার পরওয়ারদেগার! তুমি আমাকে রাষ্ট্র শাসনের হিস্যা দিয়েছো।’ (সুরা ইউসুফ: ১০১)
তারপর দীর্ঘ কারাবাস ও কঠিন পরীক্ষার পরও ইউসুফ (আ.) দায়িত্ব গ্রহণে পিছপা হননি। রাষ্ট্রের খাদ্যভাণ্ডার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চেয়ে তিনি নিজের যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন। আর সেই দায়িত্ব যথাযতভাবে পালন করেন। (সুরা ইউসুফ: ৫৪–৫৬)
হজরত ইউসুফের (আ.) এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো, এটি ছিল নবীজির (সা.) জন্য ভবিষ্যদ্বাণী। সুরা ইউসুফ নাজিলের সময়টি ছিল নবীজির (সা.) মাক্কি জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। এই সময় তার চাচা আবু তালিব ও প্রাণপ্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। কুরাইশরা মুসলমানদের একঘরে করে ফেলে, এবং তাদের অত্যাচার ও নির্যাতন বহুগুণে বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে হজরত ইউসুফের (আ.) জীবনের নানা বিপদ ও পরীক্ষার ঘটনা বর্ণনা করে আল্লাহ তার রাসুলকে সান্ত্বনা দেন। (আত-তাফসিরুল ওয়াসিত লি-তানতাবি, ৭/৩০০)
ইউসুফ (আ.) ও নবীজির (সা.) জীবনের কয়েকটি ঘটনার মধ্যে লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে:
প্রথমত, আপনজনের বিরোধিতা ও জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতা। ইউসুফের (আ.) ভাইয়েরাই তাকে কূপে ফেলে দিয়েছিল। অন্যদিকে নবীজির (সা.) বিরোধিতায় নেমেছিল তার নিজের গোত্র কুরাইশ। এক পর্যায়ে তাকে জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করা হয়।
দ্বিতীয়ত, অন্য ভূখণ্ডে গিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ। ইউসুফ (আ.) মিশরে গিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরত করে সেখানে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
তৃতীয়ত, বিরোধীদের ফিরে আসা ও ক্ষমা প্রার্থনা। এক সময় ইউসুফের (আ.) ভাইয়েরা তার কাছে ফিরে আসে এবং নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। একইভাবে মক্কা বিজয়ের সময় কুরাইশরা নবীজির (সা.) সামনে পরাজিত অবস্থায় উপস্থিত হয়। নবীজি (সা.) তাদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা করেন।
এই সাদৃশ্যগুলোর কারণে হজরত ইউসুফের (আ.) ঘাটনা উল্লেখ করে নবীজিকে (সা.) সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছিল। মাক্কি জীবনের কঠিন দিনগুলোতে এই সুরা যখন নাজিল হয়, তখন কেউ জানতো না নবীজির (সা.) জীবনের পরবর্তী দিনগুলোতে কী ঘটবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা জানতেন। পরবর্তীতে নবীজিও (সা.) হজরত ইউসুফের (আ.) মতোই বিজয়ী হন এবং নিজের আত্মীয়দের ক্ষমা করে দেন।