ঘুমের মধ্যে ফোনের শব্দ, কলিং বেল কিংবা আশপাশের সামান্য আওয়াজেও অনেকের ঘুম ভেঙে যায়। অথচ যারা রাতে বেশ জোরে নাক ডাকেন, তারা নিজের নাক ডাকার শব্দেই সাধারণত জেগে ওঠেন না। বরং গভীর ঘুমিয়ে থাকেন। কখনো কখনো পাশে থাকা মানুষটির ঘুম নষ্ট হলেও নাক ডাকা ব্যক্তির ঘুমে তেমন ব্যাঘাত ঘটে না। এখানেই প্রশ্ন, ঘুমের মধ্যে কান ও মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও নিজের নাক ডাকার শব্দ কেন কানে পৌঁছায় না?
এর পেছনে রয়েছে ঘুমের সময় মস্তিষ্কের শব্দ শনাক্ত ও প্রক্রিয়াকরণের বিশেষ পদ্ধতি। ঘুমিয়ে পড়লেও আমাদের মস্তিষ্ক বাইরের সব শব্দ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় না। বরং কোন শব্দে মনোযোগ দিতে হবে আর কোন শব্দকে কম গুরুত্ব দেওয়া যায়, তা অনেকটাই বেছে নেয়। নিজের শরীর থেকে তৈরি হওয়া পরিচিত শব্দের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় আলাদা হয়।
ঘুমের মধ্যেও আমাদের কান আশপাশের শব্দ গ্রহণ করে। সেই শব্দের সংকেত স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। তবে ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সব শব্দের প্রতি একইভাবে সাড়া দেয় না। কোন শব্দ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিবেচনা করে মস্তিষ্ক তার প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
এক্ষেত্রে থ্যালামাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মস্তিষ্কের এই অংশ ইন্দ্রিয় থেকে আসা বিভিন্ন সংকেত প্রক্রিয়াকরণ ও নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ঘুমের সময় বাইরের কোনো অচেনা বা হঠাৎ তৈরি হওয়া শব্দ মস্তিষ্কের নজর কাড়তে পারে। বিশেষ করে শব্দটি জোরে হলে বা সম্ভাব্য বিপদের ইঙ্গিত দিলে ঘুম ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে নিজের শরীর থেকে তৈরি হওয়া পরিচিত শব্দের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। নাক ডাকার শব্দও শরীরের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে তৈরি হয়। ফলে মস্তিষ্ক অনেক সময় এটিকে আলাদা করে গুরুত্ব দেয় না। এ কারণেই নিজের নাক ডাকার শব্দে সহজে ঘুম ভাঙে না।
নাক ডাকার মূল কারণ শ্বাসপ্রশ্বাসের পথের সংকীর্ণতা। ঘুমের সময় গলা ও জিভের আশপাশের পেশিগুলো স্বাভাবিকভাবেই শিথিল হয়ে আসে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই শিথিলতার কারণে ওপরের শ্বাসনালির পথ সরু হয়ে যায়।
এ অবস্থায় শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাস তুলনামূলক সংকীর্ণ পথ দিয়ে চলাচল করে। বাতাসের প্রবাহে গলার নরম টিস্যু ও আশপাশের অংশে কম্পন তৈরি হয়। এই কম্পন থেকেই নাক ডাকার পরিচিত কর্কশ শব্দ শোনা যায়।
নাক ডাকার মাত্রা সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কারও শব্দ হালকা, আবার কারও ক্ষেত্রে তা বেশ জোরে হতে পারে। নাক বন্ধ থাকা, অতিরিক্ত ওজন, ঘুমের ভঙ্গি, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং গলার গঠনের মতো বিষয়ও নাক ডাকার প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
নাক ডাকেন এমন ব্যক্তিরা যে সারা রাত একটানা গভীর ঘুমে থাকেন, তা নয়। ঘুমের মধ্যে তাদেরও সাময়িকভাবে ঘুম হালকা হতে পারে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়া বা ঘুমের গভীরতা কমে যাওয়ার ঘটনাকে বলা হয় ‘মাইক্রো-অ্যারাউজাল’।
এ ধরনের সাময়িক পরিবর্তন অনেক সময় এত অল্প সময়ের জন্য ঘটে যে ব্যক্তি পরে তা মনে রাখতে পারেন না। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মনে হতে পারে, সারা রাত নিরবচ্ছিন্ন ঘুম হয়েছে। অথচ ঘুমের মধ্যে কয়েকবার ঘুমের স্বাভাবিক ধারায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
মাঝেমধ্যে নাক ডাকা সাধারণ ঘটনা হলেও নিয়মিত খুব জোরে নাক ডাকা অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, হাঁসফাঁস করে ওঠা, দম আটকে আসার মতো শব্দ করা কিংবা ঘুমের পরও অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
এসব লক্ষণ ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ নামের ঘুমের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এ সমস্যায় ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি বারবার আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসে বিরতি তৈরি হয় এবং ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়।
তাই নিয়মিত জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসা কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে ঘুমের পরীক্ষা বা স্লিপ স্টাডির মাধ্যমে সমস্যার কারণ নির্ণয় করা যায়। নিজের নাক ডাকার শব্দে ঘুম না ভাঙলেও শরীরের অন্য সতর্কসংকেতগুলো উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, হেলথলাইন