রেস্তোরাঁয় খাবার এসেছে, টেবিলজুড়ে সাজানো পছন্দের সব পদ। চারদিকে খাবারের দারুণ ঘ্রাণ। কিন্তু খাওয়া শুরু করার তাড়া নেই! কারণ, আগে চাই কয়েকটি সুন্দর ছবি। কখনো ওপর থেকে, কখনো পাশ থেকে, আবার কখনো খাবারের সঙ্গে নিজের সেলফি। একেকটি ছবি তুলতে তুলতে খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলেও যেন সমস্যা নেই। পছন্দমতো ছবি না পাওয়া পর্যন্ত খাওয়াই শুরু হয় না।
এখনকার সময়ে রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে এমন দৃশ্য খুব একটা অপরিচিত নয়। বিরিয়ানি, পিৎজা, বার্গার থেকে শুরু করে এক কাপ কফি-সবকিছুই যেন ক্যামেরাবন্দি হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। এরপর ছবিটি জায়গা করে নেয় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা স্টোরিতে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, খাবার সামনে পেয়েও খাওয়ার আগে ছবি তোলার এত আগ্রহ কেন? এটি কি নিছক শখ, নাকি এর পেছনে রয়েছে মানুষের মনস্তত্ত্ব?
সুন্দর খাবার দেখলে ছবি তুলতে ইচ্ছা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ কোনো আয়োজন, নতুন রেস্তোরাঁ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দের মুহূর্তের স্মৃতি ধরে রাখতে চান অনেকে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন খাবার উপভোগ করার চেয়ে সেটির ছবি নিখুঁতভাবে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কোন অ্যাঙ্গেলে ছবি ভালো আসবে, আলো ঠিক আছে কি না, খাবারের রং কতটা সুন্দর দেখাচ্ছে-এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতেই কখনো খাবারের আসল স্বাদ নেওয়ার মুহূর্তটি হারিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাবারের ছবি পোস্ট করার পর লাইক, কমেন্ট কিংবা প্রশংসা পেলে ভালো লাগতেই পারে। এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া অনেকের মধ্যে আনন্দ ও স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানে একে সামাজিক স্বীকৃতি বলা হয়।
কেউ হয়তো নতুন কোনো ক্যাফেতে গিয়ে কফির ছবি পোস্ট করেন, কেউ আবার দামি রেস্তোরাঁর খাবার তুলে ধরেন। এর মধ্য দিয়ে শুধু খাবার নয়, নিজের পছন্দ ও জীবনযাপনের ধরনও অন্যদের সামনে তুলে ধরেন।
ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে সুন্দর সব খাবারের ছবি, নান্দনিক ক্যাফে কিংবা বন্ধুদের রেস্তোরাঁয় খাওয়ার মুহূর্ত। এসব দেখে অনেকেরও একই রকম অভিজ্ঞতা অর্জনের ইচ্ছা হয়। আবার নিজের অভিজ্ঞতাও অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান।
মনোবিজ্ঞানে ফিয়ার অব মিসিং আউট (ফোমো)।বলতে অন্যদের আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা থেকে নিজে বাদ পড়ে যাওয়ার ভয় বা অস্বস্তিকে বোঝায়। এই অনুভূতিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা এবং নিজের মুহূর্তগুলো শেয়ার করার প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অবশ্যই নয়। অনেকের কাছে খাবারের ছবি তোলা নিছক আনন্দের বিষয়। সুন্দর করে সাজানো খাবার, কফির কাপের ওপর নকশা, রেস্তোরাঁর আলো কিংবা টেবিলের সাজসজ্জা তাদের আকর্ষণ করে। কেউ কেউ ছবি তোলাকে সৃজনশীলতার প্রকাশ হিসেবেও দেখেন। তাই খাবারের ছবি তোলার অভ্যাসকে এককভাবে নেতিবাচক বলা যায় না।
সমস্যা ছবি তোলায় নয়, সমস্যা তখনই, যখন ছবি তোলার ব্যস্ততায় সামনের মানুষটির সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা খাবারের স্বাদ উপভোগ করাই গৌণ হয়ে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে সবাই যদি নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে একসঙ্গে থাকার আনন্দটাই ম্লান হয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা সুন্দর ছবিটি হয়তো অনেকের প্রশংসা পাবে, কিন্তু সেই মুহূর্তের প্রকৃত আনন্দ অনুভব করতে হবে নিজেকেই। তাই খাবারের ছবি তুলুন, স্মৃতি জমা রাখুন, পছন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিন। তবে খেতে বসে ক্যামেরার চেয়ে খাবার আর সামনের মানুষগুলোর দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিন। কারণ দিন শেষে প্রশ্নটা থেকেই যায়- আমরা কি খাবার খেতে বাইরে যাই, নাকি খাবারের ছবি তুলে অন্যকে দেখাতেই বেশি আগ্রহী?
সূত্র: গালফ নিউজ, ভেরি ওয়েল মাইন্ড, ইন্ডিয়া টুডে