ভূমধ্যসাগরের উত্তাল সাগরে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার হওয়ার পর মিশরের দামিয়েত্ত কারাগারে আটক ৬৫ বাংলাদেশির পরিচয় পাওয়া গেছে।
দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর সম্প্রতি জাগো নিউজের এ প্রতিবেদককে তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেয় কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং।
গত ৫ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তা কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে আটক বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের প্রত্যেককে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ করে দেন।
দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কারাগার থেকে ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় কারও চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, কারও কণ্ঠে ছিল স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে নরসিংদী জেলার ১৫ জন, কিশোরগঞ্জ জেলার ১২ জন, শরীয়তপুর জেলার ১১ জন, সুনামগঞ্জ জেলার ৮ জন, হবিগঞ্জ জেলার ৪ জন, মাদারীপুর জেলার ৪ জন এবং নাটোর ও পাবনা জেলার ১ জন করে রয়েছেন।
নরসিংদী জেলার ১৫ জন: ১. এমডি রাজান মিয়া, ২. এমডি আনোয়ার হোসেন, ৩. এমডি ইমরান মিয়া, ৪. জোনায়েদ আহম্মেদ, ৫. মেহেদী হাসান, ৬. রিফাত আহাম্মদ রনি, ৭. সিয়াম মিয়া, ৮. এমডি মামুন মিয়া, ৯. এমডি সুটন মিয়া, ১০. জাকারিয়া আহাম্মেদ হামিম, ১১. নাফিজ হোসাইন, ১২. ইউনুস মিয়া, ১৩. আরাফাত মিয়া, ১৪. হৃদয় ইসলাম, ১৫. রিফাত মিয়া।
কিশোরগঞ্জ জেলার ১২ জন: ১. এমডি রশায়েদ মিয়া, ২. আব্দুর রাজ্জাক মিয়া, ৩. এমডি সজন মিয়া, ৪. খহিনুর ইসলাম সুমন, ৫. মোসাহেদ, ৬. এমডি মাশরাফি, ৭. ওনিম মিয়া, ৮. বিজয় মিয়া, ৯. রিয়াদ মিয়া, ১০. রাকিব মিয়া, ১১. শুভ আহমেদ, ১২. এমডি আল আমিন।
শরীয়তপুর জেলার ১১ জন: ১. ইব্রাজুল ইসলাম, ২. রিদয় মিয়া, ৩. নাসির উদ্দিন সর্দার, ৪. বিপ্লব মাদবর, ৫. এমডি সেলিম মাদবর, ৬. এমডি রুবেল তালুকদার, ৭. সাইফুল ইসলাম, ৮. পারভেজ চৌকিদার, ৯. উজ্জ্বল খান, ১০. আব্দুল্লাহ আল মাহিম, ১১. আব্দুর রহিম।
সুনামগঞ্জ জেলার ৮ জন: ১. মাসুম রশিদ, ২. এমডি আলী আহমেদ, ৩. এমডি দেলোয়ার হোসেন, ৪. এমডি সায়েম আহমেদ, ৫. শাহ আলম, ৬. এমডি মাজহারুল ইসলাম রায়হান, ৭. এমডি হোসেন আহমেদ, ৮. ফজল মিয়া।
হবিগঞ্জ জেলার ৪ জন: ১. এমডি রিজন তালুকদার, ২. এমডি রিপনুল হক, ৩. এমডি রাতুল, ৪. এমডি ফরহাদ মিয়া।
মাদারীপুর জেলার ৪ জন: ১. এমডি সাগর খান, ২. এমডি নূর হোসেন হাওলাদার, ৩. নায়েম মিয়া, ৪. এমডি শহিদুল ইসলাম। এছাড়া, নাটোর জেলার এমডি মিরাজ আলী এবং পাবনা জেলার নীরব হাসান শিমুল রয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর দিবাগত রাত ৩টার দিকে লিবিয়ার তুব্রুকের শূন্য পয়েন্ট থেকে একটি রাবারের নৌকায় ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন ৬৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। তাদের মধ্যে ৬৫ জন বাংলাদেশি এবং চারজন দক্ষিণ সুদানের নাগরিক। দক্ষিণ সুদানের যাত্রীদের মধ্যে একজন নারীও ছিলেন।
যাত্রার পরদিন ১১ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে নৌকার জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর দালালদের দেওয়া ওয়াকিটকির মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন যাত্রীরা। একপর্যায়ে যোগাযোগ সম্ভব হলে দালালরা তাদের আশ্বাস দেয়, ‘তোমরা সেখানে অবস্থান করো, আমরা তোমাদের উদ্ধার করতে আসব।’
কিন্তু সেই আশ্বাস আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। দালালদের অপেক্ষায় সাগরের বুকে আরও প্রায় ২৪ ঘণ্টা কাটিয়ে দেন তারা। এদিকে নৌকার তলদেশে ছোট একটি ফুটো দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি বড় হতে থাকলে নৌকার ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে যাত্রীরা নিজেদের জামাকাপড় দিয়ে নৌকার পানি বের করার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। একদিকে জ্বালানি নেই, অন্যদিকে ফুটো নৌকায় পানি প্রবেশ করছে, সব মিলিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হন তারা।
দালালদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশপাশে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছে বিপদ সংকেত পাঠাতে শুরু করেন যাত্রীরা। উদ্ধারের আকুতি জানাতে থাকেন তারা।
একপর্যায়ে কাছাকাছি একটি জাহাজ দেখতে পেয়ে সবাই চিৎকার ও কান্নাকাটি করে সাহায্য চান। এ সময় ‘ইয়ং মং’ নামের একটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে। এরপর জাহাজটি তাদের নিয়ে আরও প্রায় এক দিন চলার পর ১৪ অক্টোবর মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে পৌঁছায়। পরে তাদের দামিয়েত্তার কারাগারে নেওয়া হয়।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, যে রাবারের নৌকায় তাদের সাগরে পাঠানো হয়েছিল, সেটি মূলত প্রায় ৩০ জন যাত্রীর উপযোগী ছিল। কিন্তু নৌকাটিতে জোর করে ৬৯ জনকে ওই তুলে দেওয়া হয়।
এর আগে, ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়েছিল। যেসব স্থানে তাদের আটকে রাখা হয়, সেগুলোকে তারা ‘গেমঘর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে ছিল না জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। বিদ্যুৎ, শৌচাগার কিংবা পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও ছিল না। ছিলো না ঘুমানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা। অমানবিক পরিবেশে দিনের পর দিন আটকে রেখে তাদের সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, ইউরোপে যাওয়ার আশায় তাদের কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ সহায়-সম্পত্তি, কেউ ফলের বাগান কিংবা অন্য সম্পদ বিক্রি করেছেন। আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা ও ঋণ করে দালালদের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে দিয়েছেন। তবু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে পেরে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তারা।
বর্তমানে দামিয়েত্তা কারাগারে আটক এসব বাংলাদেশির একটাই চাওয়া, দ্রুত কারামুক্ত হয়ে দেশে ফিরে যাওয়া। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সেই স্বপ্ন এখন তাদের কাছে অতীত। পরিবারের কাছে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে চান তারা। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানা গেছে।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশি দালালচক্রের ফাঁদে পড়ছেন। কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ নিখোঁজ হচ্ছেন, আবার কেউ বেঁচে ফিরলেও হারাচ্ছেন জীবনের শেষ সম্বলটুকু।